|
হজ গাইড উমরাহ হিল (হারামের সীমানার বাইরে মিকাতের ভেতরের স্থান) থেকে অথবা মিকাত থেকে ইহরাম বেঁধে বায়তুল্লাহ শরিফ তাওয়াফ করা, সাফা-মারওয়া সাঈ করা এবং মাথার চুল ফেলে দেওয়া বা ছোট করাকে ‘উমরাহ’ বলে৷ হজ তিন প্রকার-তামাত্তু, কিরান ও ইফরাদ৷ হজে তামাত্তু হজের মাসসমূহে (শাওয়াল, জিলকদ, জিলহজ) উমরাহর নিয়তে ইহরাম করে, উমরাহ পালন করে, পরে হজের নিয়ত করে হজ পালন করাকে ‘হজে তামাত্ত’ু বলে৷ হজে কিরান হজের মাসসমূহে একই সঙ্গে হজ ও উমরাহ পালনের নিয়তে ইহরাম করে উমরাহ ও হজ করাকে ‘হজে কিরান’ বলে৷ হজে ইফরাদ শুধু হজ পালনের উদ্দেশ্যে ইহরাম বেঁধে হজ সম্পাদনকে ‘হজে ইফরাদ’ বলে৷ তামাত্তু হজের নিয়ম ১. উমরাহর ইহরাম (ফরজ) - পরিষ্কার-পরিচছন্নতা সেরে গোসল বা অজু করে নিন৷
- মিকাত অতিক্রমের আগেই সেলাইবিহীন একটি সাদা কাপড় পরিধান করুন, আরেকটি গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ইহরামের নিয়তে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিন৷
- শুধু উমরাহর নিয়ত করে এক বা তিনবার তালবিয়া পড়ে নিন৷
তালবিয়া হলো-’লাববাইকা আল্লাহুম্মা লাববাইক, লাববাইকা লা শারিকা লাকা লাববাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাকা’
অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি তোমার দরবারে হাজির, আমি তোমার দ্বারে উপস্থিত, আমি হাজির, তোমার কোনো অংশীদার নেই, তোমার দরবারে উপস্থিত হয়েছি৷ নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নিয়ামতের সামগ্রী সবই তোমার, (সর্বযুগে ও সর্বত্র) তোমারই রাজত্ব, তোমার কোনো অংশীদার নেই৷ ২. উমরাহর তাওয়াফ (ফরজ) অজুর সঙ্গে ইজতিবাসহ তাওয়াফ করুন৷ ইহরামের চাদরকে ডান বগলের নিচের দিক থেকে পেঁচিয়ে এনে বাঁ কাঁধের ওপর রাখাকে ‘ইজতিবা’ বলে৷ হাজরে আসওয়াদকে সামনে রেখে তার বরাবর ডান পাশে দাঁড়ান (২০০৬ সাল থেকে মেঝেতে সাদা মার্বেল পাথর আর ডান পাশে সবুজ বাতি)৷ তারপর দাঁড়িয়ে তাওয়াফের নিয়ত করুন৷ তারপর ডানে গিয়ে এমনভাবে দাঁড়াবেন, যেন হাজরে আসওয়াদ পুরোপুরি আপনার সামনে থাকে৷ এরপর দুই হাত কাঁধ পর্যন্ত তুলে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ’ পড়–ন৷ পরে হাত ছেড়ে দিন এবং হাজরে আসওয়াদের দিকে হাত দিয়ে ইশারা করে হাতের তালুতে চুমু খেয়ে ডান দিকে চলতে থাকুন, যাতে পবিত্র কাবাঘর পূর্ণ বাঁয়ে থাকে৷ পুরুষের জন্য প্রথম তিন চক্করে ‘রমল’ করা সুন্নত ৷ ‘রমল’ অর্থ বীরের মতো বুক ফুলিয়ে কাঁধ দুলিয়ে ঘন ঘন কদম রেখে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলা৷ রুকনে ইয়ামানিকে সম্ভব হলে শুধু হাতে স্পর্শ করুন৷ রুকনে ইয়ামানিতে এলে ‘রাববানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আযাবান্নার, ওয়াদখিলনাল জান্নাতা মা’আল আবরার, ইয়া আযিযু ইয়া গাফফার, ইয়া রাববাল আলামিন’ বলুন৷ চুমু খাওয়া থেকে বিরত থাকুন৷ অতঃপর হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত এসে চক্কর পুরো করুন৷ পুনরায় হাজরে আসওয়াদ বরাবর দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে ইশারা করে হাতের তালুতে চুমু খেয়ে দ্বিতীয় চক্কর শুরু করুন৷ এভাবে সাত চক্করে তাওয়াফ শেষ করুন৷ - হাতে সাত দানার তসবি অথবা গণনাযন্ত্র রাখতে পারেন ৷ তাহলে সাত চক্কর ভুল হবে না৷
৩. তাওয়াফের দুই রাকাত নামাজ (ওয়াজিব) - মাকামে ইবরাহিমের পেছনে বা হারামের যেকোনো স্থানে তাওয়াফের নিয়তে (মাকরুহ সময় ছাড়া) দুই রাকাত নামাজ পড়ে দোয়া করুন৷ মনে রাখবেন, এটা দোয়া কবুলের সময়৷
৪. উমরাহর সাঈ (ওয়াজিব) - সাফা পাহাড়ের কিছুটা ওপরে উঠে (এখন আর পাহাড় নেই, মেঝেতে মার্বেল পাথর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত) কাবা শরিফের দিকে মুখ করে সাঈ-এর নিয়ত করে, দোয়ার মতো করে হাত তুলে তিনবার তাকবির বলে দোয়া করুন৷ তারপর মারওয়ার দিকে রওনা হয়ে দুই সবুজ দাগের মধ্যে (এটা সেই জায়গা, যেখানে হজরত হাজেরা (রা.) পানির জন্য দৌড়েছিলেন) একটু দ্রুত পথ চলে মারওয়ায় পৌঁছালে এক চক্কর পূর্ণ হলো৷ মারওয়া পাহাড়ে উঠে কাবা শরিফের দিকে মুখ করে দোয়ার মতো করে হাত তুলে তাকবির পড়–ন এবং আগের মতো চলে সেখান থেকে সাফায় পৌঁছালে দ্বিতীয় চক্কর পূর্ণ হলো এভাবে সপ্তম চক্করে মারওয়ায় গিয়ে সাঈ শেষ করে দোয়া করুন৷
৫. হলক করা (ওয়াজিব) - পুরুষ হলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের অনুসরণে সম্পূর্ণ মাথা মুণ্ডন করবেন, তবে মাথার চুল ছাঁটতেও পারেন৷ মহিলা হলে চুলের মাথা এক ইঞ্চি পরিমাণ কাটবেন৷
- হজের ইহরাম না বাঁধা পর্যন্ত ইহরামের আগের মতো সব কাজ করতে পারবেন৷
৬. হজের ইহরাম (ফরজ) - হারাম শরিফ বা বাসা থেকে আগের নিয়মে শুধু হজের নিয়তে ইহরাম বেঁধে ৮ জিলহজ জোহরের আগেই মিনায় পৌঁছে যাবেন৷
৭. মিনায় অবস্থান (সুন্নত) - ৮ জিলহজ জোহর থেকে ৯ জিলহজ ফজরসহ মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় আদায় করুন এবং এ সময়ে মিনায় অবস্থান করুন৷
৮. আরাফাতের ময়দানে অবস্থান (ফরজ) - আরাফাতের ময়দানে অবস্থান হজের অন্যতম ফরজ৷
- ৯ জিলহজ দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করুন৷ এদিন নিজ তাঁবুতে জোহর ও আসরের নামাজ স্ব স্ব সময়ে আলাদাভাবে আদায় করুন৷ মুকিম হলে চার রাকাত পূর্ণ পড়–ন৷ মসজিদে ‘নামিরা’য় উভয় নামাজ জামাতে পড়লে একসঙ্গে আদায় করতে পারেন৷ যদি ইমাম মুসাফির হন আর মসজিদে নামিরা যদি আপনার কাছ থেকে দূরে থাকে, তাহলে সেখানে অবস্থান করবেন৷ মাগরিবের নামাজ না পড়ে মুজদালিফার দিকে রওনা হোন৷
৯. মুজদালিফায় অবস্থান (সুন্নত) ১০. কঙ্কর মারা (প্রথম দিন) - ১০ জিলহজ ফজর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত শুধু বড় জামারাকে (বড় শয়তান) সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করুন (ওয়াজিব)৷ এ সময়ে সম্ভব না হলে এ রাতের শেষ পর্যন্ত কঙ্কর মারতে পারেন৷ দুর্বল ও নারীদের জন্য রাতেই কঙ্কর মারা উত্তম ও নিরাপদ৷
কঙ্কর মারার স্থানে বাংলা ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়; তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং মেনে চলুন৷
১১. কোরবানি করা (ওয়াজিব) - ১০ জিলহজ কঙ্কর মারার পরই কেবল কোরবানি নিশ্চিত পন্থায় আদায় করুন৷
কোরবানির পরেই কেবল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের অনুসরণে মাথা হলক করুন (ওয়াজিব)৷ তবে চুল ছোটও করতে পারেন৷ খেয়াল রাখবেন: কঙ্কর মারা, কোরবানি করা ও চুল কাটার মধ্যে ধারাবাহিকতা জরুরি ও ওয়াজিব; অন্যথায় দম বা কাফফারা দিয়ে হজ শুদ্ধ করতে হবে৷ বর্তর্মানে এই সমস্যা সমাধানের সহজ উপায় হজে ইফরাদ করা৷ যেখানে কোরবানি নেই৷ হজের পরে উমরাহ করা যায়৷
১২. তাওয়াফে জিয়ারত (ফরজ) - ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগেই তাওয়াফে জিয়ারত করে নিতে হবে৷ তা না হলে ১২ জিলহজের পরে তাওয়াফটি করে দম দিতে হবে৷ তবে নারীরা প্রাকৃতিক কারণে করতে না পারলে পবিত্র হওয়ার পরে করবেন৷
১৩. কঙ্কর মারা (ওয়াজিব) - ১১ ও ১২ জিলহজ কঙ্কর মারা (ওয়াজিব)৷ ১১-১২ জিলহজ দুপুর থেকে সময় আরম্ভ হয়৷ ভিড় এড়ানোর জন্য আসরের পর অথবা আপনার সুবিধাজনক সময়ে সাতটি করে কঙ্কর মারবেন-প্রথমে ছোট, মধ্যম, তারপর বড় শয়তানকে৷ ছোট জামারা থেকে শুরু করে বড় জামারায় শেষ করুন৷ সম্ভব না হলে শেষরাত পর্যন্ত মারতে পারেন৷ দুর্বল ও নারীদের জন্য রাতেই নিরাপদ৷
১৪. মিনা ত্যাগ - ১৩ জিলহজ মিনায় না থাকতে চাইলে ১২ জিলহজ সন্ধ্যার আগে অথবা সন্ধ্যার পর ভোর হওয়ার আগে মিনা ত্যাগ করুন৷ সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করতেই হবে-এটা ঠিক নয়৷ তবে সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করা উত্তম৷
১৫. বিদায়ী তাওয়াফ (ওয়াজিব) - বাংলাদেশ থেকে আগত হজযাত্রীদের হজ শেষে বিদায়ী তাওয়াফ করতে হয় (ওয়াজিব)৷
তবে হজ শেষে যেকোনো নফল তাওয়াফই বিদায়ী তাওয়াফে পরিণত হয়ে যায়৷ নারীদের মাসিকের কারণে বিদায়ী তাওয়াফ করতে না পারলে কোনো ক্ষতি নেই; দম বা কাফফারাও দিতে হয় না৷
১৬. মিনায় অবস্থানরত দিনগুলোতে (১০, ১১ জিলহজ) মিনাতেই রাত যাপন করুন৷ আর ১২ তারিখ রাত যাপন করুন যদি ১৩ তারিখ ‘রমি’ (কঙ্কর ছুড়ে মারা) শেষ করে ফিরতে চান (সুন্নত)৷ কিরান হজ - ইহরাম বাঁধা (ফরজ)
- জেদ্দা পৌঁছানোর আগে একই নিয়মে ইহরাম করার কাজ সমাপ্ত করুন৷ তবে তালবিয়ার আগেই হজ ও উমরাহ উভয়ের নিয়ত একসঙ্গে করুন৷
- উমরাহর তাওয়াফ (পূর্বে বর্ণিত) নিয়মে আদায় করুন (ওয়াজিব)৷
- উমরাহর সাঈ করুন, তবে এরপর চুল ছাঁটবেন না; বরং ইহরামের সব বিধিবিধান মেনে চলুন (ওয়াজিব)৷
- তাওয়াফে কুদুম করুন (সুন্নত)৷
- এরপর সাঈ করুন, যদি এ সময় সাঈ করতে না পারা যায় তাওয়াফে জিয়ারতের পরে করুন (ওয়াজিব)৷
- আট জিলহজ জোহর থেকে ৯ জিলহজ ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনাতে পড়–ন৷ এ সময়ে মিনাতে অবস্থান করুন (সুন্নত)৷
- আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করুন (ফরজ)৷
- নয় জিলহজ সূর্যাস্তের পর থেকে মুজদালিফায় অবস্থান এবং মাগরিব ও এশা একসঙ্গে এশার সময়ে আদায় করুন (সুন্নত)৷ তবে ১০ জিলহজ ফজরের পর কিছু সময় অবস্থান করুন (ওয়াজিব)৷
- ওপরে বর্ণিত নিয়ম ও সময় অনুসারে ১০ জিলহজ কঙ্কর নিক্ষেপ করুন (ওয়াজিব)৷
- কোরবানি করুন (ওয়াজিব)৷
- মাথার চুল মুণ্ডন করে নিন (ওয়াজিব)৷ তবে চুল ছেঁটেও নিতে পারেন৷
- তাওয়াফে জিয়ারত করুন (ফরজ) এবং সাঈ করে নিন, যদি তাওয়াফে কুদুমের পরে না করে থাকেন৷
- এগারো-বারো জিলহজ কঙ্কর নিক্ষেপ করুন (ওয়াজিব)৷ ১৩ জিলহজ কঙ্কর মারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ৷
- মিনায় থাকাকালীন মিনাতেই রাত যাপন করুন (সুন্নত)৷
- মিকাতের বাইরে থেকে আগত হাজিরা বিদায়ী তাওয়াফ করুন (ওয়াজিব)৷
ইফরাদ হজ - শুধু হজের নিয়তে (আগে বর্ণিত) ইহরাম বাঁধুন (ফরজ)৷
- মক্কা শরিফ পৌঁছে তাওয়াফে কুদুম করুন (সুন্নত)৷
- সাঈ করুন (ওয়াজিব)৷ এ সময়ে সম্ভব না হলে সাঈ তাওয়াফে জিয়ারতের পরে করুন৷
- মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও রাত যাপন করুন (সুন্নত)৷
- আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করুন (ফরজ)৷
- মুজদালিফায় অবস্থান করুন (সুন্নত)৷ তবে ১০ জিলহজ ফজরের পর কিছু সময় অবস্থান ওয়াজিব৷
- ১০ জিলহজে জামারাতে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করুন (ওয়াজিব)৷
- যেহেতু এ হজে কোরবানি ওয়াজিব নয়, তাই কঙ্কর নিক্ষেপের পর মাথা হলক করে নিন; তবে চুল ছেঁটেও নিতে পারেন (ওয়াজিব)৷
- তাওয়াফে জিয়ারত করুন (ফরজ) এবং যদি তাওয়াফে কুদুমের পর সাঈ না করে থাকেন, তাহলে সাঈ করে নিন (ওয়াজিব)৷
- ১১-১২ জিলহজ আগে বর্ণিত নিয়ম ও সময়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করুন (ওয়াজিব)৷
- বদলি হজকারী ইফরাদ হজ করবেন৷
ইহরাম সম্পর্কে জরুরি বিষয় - যাঁরা সরাসরি বাংলাদেশ থেকে মক্কা শরিফ যাবেন, তাঁরা বাড়িতে, হাজি ক্যাম্পে বা বিমানে ইহরাম করে নেবেন৷ বাড়িতে বা হাজি ক্যাম্পে ইহরাম করে নেওয়া সহজ৷ ইহরাম ছাড়া যেন মিকাত অতিক্রম না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে৷
- যাঁরা মদিনা শরিফ যাবেন, তাঁরা মদিনা থেকে মক্কা যাওয়ার সময় ইহরাম করবেন৷ কোনো নারী প্রাকৃতিক কারণে অপবিত্র হয়ে থাকলে ইহরামের প্রয়োজন হলে অজু-গোসল করে নামাজ ব্যতীত ‘লাববাইক’ পড়ে ইহরাম করে নেবেন৷ তাওয়াফ ছাড়া হজ, উমরাহর সমস্ত কাজ নির্ধারিত নিয়মে আদায় করবেন৷
তাওয়াফ ও সাঈ করার সময় বিশেষভাবে লক্ষণীয় - তাওয়াফের সময় অজু থাকা জরুরি৷ তবে সাঈ (সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাতবার যাওয়া আসা করা) করার সময় অজু না থাকলেও সাঈ সম্পন্ন হয়ে যাবে৷
- হাজরে আসওয়াদে চুমু দেওয়া একটি সুন্নত৷ তা আদায় করতে গিয়ে লোকজনকে ধাক্কাধাক্কির মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া বড় গুনাহ৷ তাই তাওয়াফকালে বেশি ভিড় দেখলে ইশারায় চুমু দেবেন৷
- সাঈ করার সময় সাফা থেকে মারওয়া কিংবা মারওয়া থেকে সাফা প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন চক্কর৷ এভাবে সাতটি চক্কর সম্পূর্ণ হলে একটি সাঈ পূর্ণ হবে৷
ইহরাম অবস্থায় যেসব কাজ নিষিদ্ধ - সহবাস এবং ওই বিষয়ে কোনো আলোচনা করা যাবে না৷
- পুরুষদের জন্য শরীরের আকৃতি নেয় এমন কোনো সেলাই করা জামা, পায়জামা ইত্যাদি পরা বৈধ নয়৷
- কথা ও কাজে কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না৷
- পুরুষদের ক্ষেত্রে মাথা বা মুখ ঢাকা যাবে না; এমনকি টুপিও পরা যাবে না৷
- মহিলাদের মাথায় অবশ্যই কাপড় রাখতে হবে, তবে মুখমণ্ডল স্পর্শ করে এমন কাপড় পরবেন না৷
- নখ, চুল, দাড়ি-গোঁফ ও শরীরের একটি পশমও কাটা বা ছেঁড়া যাবে না৷
- কোনো ধরনের সুগন্ধি লাগানো যাবে না৷
- কোনো ধরনের শিকার করা যাবে না৷
- ক্ষতিকারক সকল প্রাণী মারা যাবে৷ ক্ষতি করে না এমন কোনো প্রাণী মারা যাবে না৷
- সৌদি আরবে অবস্থানকালে ট্রাফিক আইন মেনে চলুন, সিগন্যাল পড়লে রাস্তা পার হোন৷ রাস্তা পার হওয়ার সময় অবশ্যই ডানে-বাঁয়ে দেখেশুনে সাবধানে পার হবেন৷ কখনো দৌড় দেবেন না৷
হাঁচি কিংবা কাশি দেওয়ার সময় অবশ্যই আপনার মুখ ঢেকে নিন৷ শরীরের কোনো স্থান কেটে গেলে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম ব্যবহার করুন এবং ক্ষতস্থানটি প্লাস্টার কিংবা ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে দিন৷
সৌদি আরবে অবস্থানকালে কোনো চাঁদা ওঠানো, সাহায্য চাওয়া, ভিক্ষা করা দণ্ডনীয় অপরাধ৷ সুতরাং এগুলো থেকে বিরত থাকুন৷ মনে রাখবেন, মসজিদে নববী ও মসজিদুল হারামের সীমানার মধ্যে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ৷ কাবা শরিফ ও মসজিদে নববীর ভেতরে কিছুদূর পরপর পবিত্র কোরআন মজিদ রাখা আছে আর পাশে জমজম পানি (স্বাভাবিক ও ঠান্ডা) খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে৷ হজযাত্রীদের যাবতীয় তথ্য, দেশের পরিবার-পরিজনের কাছে ই-মেইলের মাধ্যমে সংবাদ পৌঁছানো যায়৷ হারানো হজযাত্রীদের খুঁজে পাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশ হজ মিশনে বিজনেস অটোমেশন লি. আইটি হেল্প ডেস্ক সাহায্য করে৷ কোনো ধরনের অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনায় পড়লে বাংলাদেশ হজ মিশনের মেডিকেল সদস্যদের (চিকিৎসক) সঙ্গে যোগাযোগ করুন৷ হজের সময় হজযাত্রীদের যেন কোনো রকম কষ্ট না হয়৷ আপনার ট্রাভেল এজেন্সি আপনাকে যথাযথ সুবিধাদি (দেশ থেকে আপনাকে থাকা, খাওয়াসহ অন্য যেসব সুবিধার কথা বলেছিল) না দিলে আপনি মক্কা ও মদিনার বাংলাদেশ হজ মিশনকে জানাতে পারেন৷ এতেও আপনি সন্তুষ্ট না থাকলে সৌদির ওয়াজারাতুল হজকে (হজ মন্ত্রণালয়) লিখিত অভিযোগ করতে পারেন৷ মদিনা থেকে যদি মক্কায় আসেন, তাহলে ইহরামের কাপড় সঙ্গে নিতে হবে৷ আরাফাতের ময়দানে অনেক প্রতিষ্ঠান বিনা মূল্যে খাবার, জুস, ফল ইত্যাদি দিয়ে থাকে৷ ওই সব খাবার আনতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি হয়, তাই সাবধান থাকবেন৷ মুজদালিফায় রাতে থাকার জন্য প্লাস্টিকের পাটি পাওয়া যায়৷ মক্কায়ও কিনতে পারবেন৷ আরাফাতের ময়দান থেকে যদি হেঁটে মুজদালিফায় আসেন, পথে টয়লেট সেরে নেবেন৷ কেননা মুজদালিফার টয়লেটে অনেক ভিড় লেগে যায়৷ হজ মন্ত্রণালয় মিনার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে (যেখানে হজযাত্রীদের সহজে চোখে পড়ে) কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত ইলেকট্রনিক বিলবোর্ডে পৃথিবীর প্রায় ১৮টি ভাষায় বিভিন্ন জরুরি দিকনির্দেশনা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাংলায় প্রচার করে৷ হজের বেশির ভাগ সময় হজযাত্রীদের মিনায় তাঁবুতে অবস্থান করতে হয়৷ তাই মিনাকে এক হিসেবে তাঁবুর শহর বলা যায়৷ চারদিকে তাঁবু আর তাঁবু-সব তাঁবু দেখতে একই রকম৷ মোয়াল্লিম নম্বর বা তাঁবু নম্বর জানা না থাকলে যে কেউই হারিয়ে যেতে পারেন৷ বিশেষ করে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের বড় অংশ বৃদ্ধ বয়সে হজ করতে আসেন৷ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখেন না৷ অনেকে হারিয়ে ফেলেন গন্তব্য৷ বাংলাদেশি হজযাত্রী কিছু আছেন সচেতন, তাঁরা বাদে বাকিরা তাঁবু নম্বর মনে রাখতে পারেন না৷ সব তাঁবু দেখতে একই রকম হওয়ায় পথ হারিয়ে ফেলেন৷ বাংলাদেশের পতাকা বা বাংলায় কথা বলা শুনে প্রবাসী বাংলাদেশি হজকর্মীরা তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন৷ এ সমস্যা এড়ানোর জন্য যে তাঁবুতে অবস্থান করেন, সেসব তাঁবু চিহ্নিত করে নিন৷ মোয়াল্লিম অফিস থেকে তাঁবুর নম্বরসহ কার্ড দেওয়া হয়; তা যত্নে রাখুন৷ বাইরে বের হওয়ার সময় সঙ্গে রাখুন৷ হজযাত্রী সচেতন থাকলে হারিয়ে যাওয়ার কোনো ভয় নেই৷ অনেক বাংলাদেশি হারিয়ে যাওয়ার কারণে হজের আহকাম বা নিয়ম-কানুন ঠিকমতো পালন করতে পারেন না৷ মক্কা-মদিনায় প্রচুর বাংলাদেশি হোটেল আছে৷ মক্কার হোটেলগুলোর নাম ঢাকা, এশিয়া, চট্টগ্রাম, জমজম ইত্যাদি৷ এসব হোটেলে ভাত, মাছ, মাংস, সবজি, ডাল-সবই পাওয়া যায়৷ হোটেল থেকে পার্সেলে বাড়িতে খাবার নিয়ে দুজন অনায়াসে খেতে পারেন৷ মক্কা-মদিনায় প্রচুর ফলমূল ও ফলের রস পাওয়া যায়৷ এগুলো কিনে খেতে পারেন৷ মক্কা-মদিনায় অনেক বাংলাদেশি কাজ করেন, তাই ভাষাগত কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়৷ কেনাকাটার সময় দরদাম করে কিনবেন৷ হজের সময় প্রচুর হাঁটাচলা করতে হয়, পকেটে টাকা থাকলেও যানবাহন পাওয়া যায় না৷ মিনায় চুল কাটার লোক পাওয়া যায়৷ নিজেরা নিজেদের চুল কাটবেন না, এতে মাথা কেটে যেতে পারে৷ মিনায় কোনো সমস্যা হলে হজযাত্রীদের সেবা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ হজ মিশনের তাঁবুতে যোগাযোগ করবেন৷ মক্কা-মদিনা থেকে বাংলাদেশে কম খরচে ফোন করা যায় (কোনো বাংলাদেশিকে বললে দেখিয়ে দেবেন)৷ সৌদি আরবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে চাইলে সঙ্গে সেট নিয়ে যাবেন, ওখানে (হজ প্যাকেজ) মোবাইল সিম কিনতে পাওয়া যায়৷ হজের আগে ও পরে আরও উমরাহ করতে চাইলে ‘তানঈম মসজিদ’-এ (উমরাহ মসজিদে) গিয়ে উমরাহর নিয়ত করে আসা যায়৷ কাবা শরিফের বাইরে বাস অথবা ট্যাক্সিতে উমরাহ মসজিদে যাওয়া যায়৷ মসজিদে নববীতে নারীদের জন্য আলাদা নামাজ পড়ার জায়গা আছে৷
|
|